‘শিশুরাই সব’-এর মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদন
শিশুহত্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকায়, কম সিলেট ও বরিশালে
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৬:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
- / 188
দেশে শিশু হত্যা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধী শিশু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তথ্য প্রায় অনুপস্থিত বলে উঠে এসেছে একটি বিশ্লেষণে। শিশু অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদনে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ঘটনায় শিশুদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা মানসিক প্রতিবন্ধিতা ছিল কি না তা সংবাদে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে কতজন প্রতিবন্ধী শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একইভাবে দারিদ্র্য, জাতিসত্তা বা প্রান্তিক অবস্থানের তথ্যও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ১২৪ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ জন ছেলে এবং ৬৩ জন মেয়ে। নিহত শিশুদের মধ্যে দুইজনের লিঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায়নি। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১১টি শিশুহত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড গ্রামীণ এলাকায় ঘটেছে। সেখানে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে সংঘটিত বেশিরভাগ শিশুহত্যা জনপরিসর বা প্রকাশ্য স্থানে ঘটেছে। বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শিশুহত্যা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে (৩৮টি)। অন্যদিকে সিলেট ও বরিশালে সর্বনিম্ন পাঁচটি করে ঘটনা ঘটেছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বয়সসীমার অন্তত ৬৪ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, যাদের বড় অংশই পরিচিত ব্যক্তিদের হাতে নিহত হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের স্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬৬ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে- যার মধ্যে নিজের ঘর বা আত্মীয়ের বাসা অন্তর্ভুক্ত। প্রায় ১৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে জনপরিসরে যেমন রাস্তা, মাঠ, বাজার বা জলাশয়ের আশেপাশে। এছাড়া প্রায় ১২ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, যেখানে কখনও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে।
শিশুহত্যার পেছনে পারিবারিক সহিংসতা ও দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে দাম্পত্য কলহ, আর্থিক সংকট, পরকীয়া, অবহেলা বা শাস্তির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রায় ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ হিসেবে দেখা গেছে। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর প্রমাণ নষ্ট করতে শিশুদের হত্যা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মোট ৩০৮ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এর একটি ছিল মাগুরায় আট বছর বয়সী শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। ২০২৫ সালের মার্চে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় অভিযোগ ওঠে, শিশুটিকে তার আপন দুলাভাই ও শ্বশুর যৌন নির্যাতন করেন। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলেও ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয় এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মে মাসে আদালত রায় প্রদান করে।
আরেকটি ঘটনায় ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক শিশুকে খাবার দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে এবং অন্যজনকে ধরতে অভিযান চালায়।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন, নীতি, অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থাকে আরও শিশু-সংবেদনশীল করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের অধিকার রক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।





























